সুদহার অপরিবর্তিত রাখল ফেড

যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ বাবদ খরচ ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) টানা পঞ্চম বৈঠকে নীতিগত সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পরই বাজারে এ পরিবর্তন দেখা যায়। তবে সুদহার না বাড়ালেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ আরো বেড়েছে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের জেরে তেলের দাম বাড়তে থাকায় মূল্যস্ফীতি ফের দীর্ঘমেয়াদি আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিবেদন বলছে, ফেডের সিদ্ধান্তের পর ৩০ বছরের মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বেড়ে সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ২৩ শতাংশে ওঠে। পরে তা ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছায়। ২০০৭ সালের পর এটি সর্বোচ্চ অবস্থান।

অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের খরচ পরিমাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে এ ইল্ড বিবেচনা করা হয়। এর বৃদ্ধি সাধারণত সরকার, প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের জন্য ঋণ নেয়া ব্যয়বহুল করে তোলে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বৃদ্ধি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। বিশ্বের নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড বাড়লে আন্তর্জাতিক ঋণগ্রহণের ব্যয় বাড়ার প্রবণতা দেখা দেয়। পাশাপাশি শেয়ারবাজার, মুদ্রাবাজার ও বৈশ্বিক পণ্যের বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফেড এবারো নীতিগত সুদহার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রেখেছে। এটি টানা পঞ্চম বৈঠক, যেখানে সুদহার পরিবর্তন করা হয়নি। তবে ফেডের চেয়ার কেভিন ওয়ার্শ জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো ধরনের শিথিলতা দেখাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজ থেকে নীতিগত সুদহার না বাড়ালেও বাজারে ঋণের খরচ ঠিকই বেড়ে গেছে। জুন ও জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে শেয়ার ও বন্ডের মতো আর্থিক বাজারে বেশকিছু পরিবর্তন ঘটে। ফলে বাজার নিজেই ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।’

এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি অনেক বিনিয়োগকারী। তাদের প্রশ্ন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলে ফেড সুদহার বাড়ায়নি কেন?

ডিআরডব্লিউ ট্রেডিংয়ের অর্থনৈতিক কৌশলবিদ লু ব্রায়েন বলেন, ‘ফেডের ব্যাখ্যা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি।’

পিজিআইএমের প্রধান মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট সকিনের মতে, সংবাদ সম্মেলনের সুদহার না বাড়ানোর কারণ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না করা ছিল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

ফেডের সিদ্ধান্তের পর স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি বন্ডের ইল্ডে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। দুই বছরের ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড প্রথমে কমে যায়। পরে কিছুটা বেড়ে প্রায় ৪ দশমিক ২৮ শতাংশে দাঁড়ায়। অন্যদিকে ৩০ বছরের বন্ডের ইল্ড বাড়তে থাকে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিনিয়োগকারীরা স্বল্পমেয়াদে সুদহার স্থিতিশীল থাকবে বলে মনে করলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়ছে বলে ধারণা করছেন।

এছাড়া ইউরোপের সরকারি বন্ডের ইল্ডও বেড়েছে। জার্মানির ৩০ বছরের বন্ডের ইল্ড ৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও যুক্তরাজ্যের ৩০ বছরের ইল্ড ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

ফেডের ভেতরেও মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটির তিন সদস্য এবার সুদহার বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

বার্কলেজের অর্থনীতিবিদ মার্ক জিয়ানোনি বলেন, ‘ফেড সুদহার অপরিবর্তিত রাখলেও তাদের অবস্থান এখনো কঠোর। কমিটির ভেতরে সুদ বাড়ানোর পক্ষে উল্লেখযোগ্য সমর্থন রয়েছে।’

ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে অন্যতম কারণ মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। ইরানকে ঘিরে সংঘাত বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীর হয়ে পড়েছে। আবার নতুন করে লোহিত সাগর ও বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়ছে। সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, তেলের দাম বাড়লে শুধু জ্বালানির খরচই বাড়ে না। পরিবহন, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছায়। ফলে মূল্যস্ফীতি আরো বিস্তৃত হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়ার প্রভাব। এসব কারণে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিতে মূল্যচাপ কমার কোনো লক্ষণ দেখছেন না বিশ্লেষকরা।

মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে ফেডের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য ২ শতাংশ। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সে লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আরও